ঢাকা ০৫:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

চাঁদপুরে জবাইয়ের পর বকরি হয়ে যাচ্ছে খাসি, প্রতারিত ক্রেতা

চাঁদপুর শহরের পালবাজারে বকরি ছাগলকে খাসি বলে বিক্রি করায় ভোক্তাগণ প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। শরিয়তপুরের সখিপুর থেকে আনা হচ্ছে এসব বকরি ছাগল। ভোজন রসিকদের খাসির চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ ভোক্তার সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে বাজারের কতিপয় অসাধু চক্রটি মোটাদাগে এই প্রতারণায় মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে।
২৪ মে শুক্রবার সকালে পালবাজারে অবস্থান নিলে ভোক্তাগণ বকরি ছাগলকে খাসি বলে বিক্রির প্রতারণার অভিযোগ তোলেন।
ক্রেতা শ্যামল, আলমগীর, পার্থসহ আরো অনেকে জানান, পালবাজারে খাসির মাংস কিনতে গিয়ে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছি। ওজনে কম, মাংসে পানি প্রয়োগ, বকরির মাংস খাসি বলে চালিয়ে দেয়া, খাসির মাংসে বকরি মিশিয়ে বিক্রি, ক্রেতার ওগোচরে চর্বি, হাড় ও খাওয়ার অযোগ্য অংশ মিশিয়ে বিক্রি যেনো এ বাজারে নিয়মে পরিণত হয়েছে। এরমধ্যে মহামারী ধারণ করেছে খাসির নামে বকরি ছাগলের মাংস বিক্রি।
জানা যায়, পালবাজারে জাকির বেপারী, হানিফ ঢালী, খলিল বেপারী, আলমগীর বেপারী ও সুফিয়ান বেপারী দীর্ঘদিন যাবৎ খাসি বিক্রির নামে বকরি বিক্রি করে লোক ঠকাচ্ছেন। অনেক সময় এরা না থাকলেও তাদের দোকানের কর্মচারী কসাইরা একই কায়দায় লোক ঠকাচ্ছে। তাই এই প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ চাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
সরজমিনে দেখা যায়, যারা মাংস চিনে ফেলছে তাদের কাছে বকরি ছাগলের মাংস ৮৫০ থেকে ৯শ’ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। আর যারা চিনতে পারছে না তাদের কাছে এই বকরির মাংসই খাসির মাংস বলে ১১০০ হতে ১২০০ টাকা দাম কেজি প্রতি রাখা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাজারের ব্যবসায়ীগণ জানায়, শরিয়তপুরের সখিপুর থেকে রোগা ও দুর্বল বকরি ছাগল গুলো কিনে আনেন এই পালবাজারের খাসি বিক্রেতারা। সকাল ৬টা হতে দুপুর ২/৩ টা পর্যন্ত এগুলো খাসি বলে বিক্রি করে লোক ঠকাতে তারা ব্যস্ত থাকেন। সখিপুর থেকে শহরে নিয়ে আসার পর বকরি ছাগল জবাইয় শেষে এগুলি বিশেষ কায়দায় কসাইরা খাসিতে রূপ দেয়। যা সরল বিশ্বাসে কিনে প্রতিনিয়ত ভোক্তারা ঠকছেন। প্রতারক এই সব খাসি বিক্রেতারা খাসির একটি পায়ের সাথে জবাইয়ের পর বকরির একটি পা মিলিয়ে ঝুলিয়ে রেখে খাসির মাংস বলে বিক্রি করেন। মাংস কেটে ওজন দেওয়ার আগে পলিথিন ব্যাগে রাখার সময় হাতে লুকিয়ে রাখা চর্বি বা খাওয়ার অযোগ্য অংশও দ্রুতই মিশিয়ে দিচ্ছেন। এছাড়াও মাংসে পানি মিশিয়েও ওজন অনেক বাড়িয়ে প্রতারণার মাধ্যমে বকরি খাসি বলে বিক্রি করছেন।
মায়ের দোয়া খাসি বিতানের কর্মচারী মনির পাটোয়ারী বলেন, লবনের দাম বেশি হওয়ায় খাসি বা বকরি ছাগলের চামড়া বিক্রি করা যায় না। ঢাকাতে ২০/২৫ টাকা চামড়া। সেক্ষেত্রে আধাকেজি লবনের দাম ১৫ টাকা। তাই চামড়া এবং ময়লা আবর্জনা বস্তা বেধে নদীতে ফেলে দেই। এতে আমাদের পোষায় না। সেজন্য কৌশল করে মাংস বিক্রি করতে হচ্ছে।
মাংস বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমান বাজারে খাসির আমদানী কম। এই ব্যবসায় আগের মতো লাভ নেই। ঢাকার পার্টির জন্য আমরা খাসি ছাগল কিনতে পারি না। তারা বেশি দাম দিয়ে খাসি ছাগল কিনে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছে। আসল খাসির মাংস ১১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও আমাদের পোষাচ্ছে না। তবে বকরির মাংসকে খাসির মাংস বলে বিক্রি করার অভিযোগটি পুরোপুরি সত্য নয়।
লিটন শেখ নামের আরেক কসাই বলেন, মুগুর, ছুরি চাকু ব্যবহার করে মাত্র ১৫ মিনিটেই আমরা একটি ছাগল জবাই করে মাংস ছাড়িয়ে বিক্রি করতে পারি। এখানে দিনে ৬শ’ টাকা হাজিরায় কাজ করছি। বকরি গুলো খাসি বলে চালায় মূলত হোটেল ব্যবসায়ীরা। শহরের প্রায় সব হোটেল রেঁস্তোরাতেই বকরির মাংস খাসি বলে চালানো হচ্ছে। বরং আমরা ক্রেতাদের দাড় করিয়ে রেখে তাদের সামনেই খাসি জবাই করে মাংস বিক্রি করছি।
যদিও খাসি বিক্রেতাদের সংরক্ষিত মজুদাগারে হাতে গোনা ২/৩টি খাসি বাদে সবই বকরি দেখতে পায় এ প্রতিবেদক। বিষয়টি চাঁদপুর জেলা ভোক্তা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নূর হোসেন রূবেলকে অবগত করলে তিনি বলেন, দ্রুতই এই বিষয়ে পালবাজারে খাসির মাংসের দোকানগুলোতে অভিযান পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিষয়ে চাঁদপুর সদরের এসিল্যান্ড মোঃ আল এমরান খানকে অবগত করলে তিনি বলেন, আমরা পালবাজারের খাসির মাংসের পাশাপাশি ৪/৫টি গরুর মাংসের দোকান নিয়েও বিস্তর অভিযোগ পেয়েছি। প্রধান অভিযোগ হচ্ছে পানি মিশ্রিত ও বয়স্ক গরুর মাংস বিক্রি এবং ভোক্তাদের ওজনে কম দেওয়া। অপরদিকে মাংস বিক্রির বাজারের সামনে ত্রেতাদেরকে নিয়ে বিক্রেতাদের টানাটানি করায় সাধারণ লোকজনও সেপথ দিয়ে যেতে বিব্রতবোধ করেন। বিষয়টি নিয়ে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দ্রুতই ব্যবস্থা নিবো।
জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁদপুরে মাদরাসাতু মুহাম্মদ সাঃ উদ্বোধন

চাঁদপুরে জবাইয়ের পর বকরি হয়ে যাচ্ছে খাসি, প্রতারিত ক্রেতা

আপডেট সময় : ০৯:০২:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪
চাঁদপুর শহরের পালবাজারে বকরি ছাগলকে খাসি বলে বিক্রি করায় ভোক্তাগণ প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। শরিয়তপুরের সখিপুর থেকে আনা হচ্ছে এসব বকরি ছাগল। ভোজন রসিকদের খাসির চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ ভোক্তার সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে বাজারের কতিপয় অসাধু চক্রটি মোটাদাগে এই প্রতারণায় মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে।
২৪ মে শুক্রবার সকালে পালবাজারে অবস্থান নিলে ভোক্তাগণ বকরি ছাগলকে খাসি বলে বিক্রির প্রতারণার অভিযোগ তোলেন।
ক্রেতা শ্যামল, আলমগীর, পার্থসহ আরো অনেকে জানান, পালবাজারে খাসির মাংস কিনতে গিয়ে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছি। ওজনে কম, মাংসে পানি প্রয়োগ, বকরির মাংস খাসি বলে চালিয়ে দেয়া, খাসির মাংসে বকরি মিশিয়ে বিক্রি, ক্রেতার ওগোচরে চর্বি, হাড় ও খাওয়ার অযোগ্য অংশ মিশিয়ে বিক্রি যেনো এ বাজারে নিয়মে পরিণত হয়েছে। এরমধ্যে মহামারী ধারণ করেছে খাসির নামে বকরি ছাগলের মাংস বিক্রি।
জানা যায়, পালবাজারে জাকির বেপারী, হানিফ ঢালী, খলিল বেপারী, আলমগীর বেপারী ও সুফিয়ান বেপারী দীর্ঘদিন যাবৎ খাসি বিক্রির নামে বকরি বিক্রি করে লোক ঠকাচ্ছেন। অনেক সময় এরা না থাকলেও তাদের দোকানের কর্মচারী কসাইরা একই কায়দায় লোক ঠকাচ্ছে। তাই এই প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ চাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
সরজমিনে দেখা যায়, যারা মাংস চিনে ফেলছে তাদের কাছে বকরি ছাগলের মাংস ৮৫০ থেকে ৯শ’ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। আর যারা চিনতে পারছে না তাদের কাছে এই বকরির মাংসই খাসির মাংস বলে ১১০০ হতে ১২০০ টাকা দাম কেজি প্রতি রাখা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাজারের ব্যবসায়ীগণ জানায়, শরিয়তপুরের সখিপুর থেকে রোগা ও দুর্বল বকরি ছাগল গুলো কিনে আনেন এই পালবাজারের খাসি বিক্রেতারা। সকাল ৬টা হতে দুপুর ২/৩ টা পর্যন্ত এগুলো খাসি বলে বিক্রি করে লোক ঠকাতে তারা ব্যস্ত থাকেন। সখিপুর থেকে শহরে নিয়ে আসার পর বকরি ছাগল জবাইয় শেষে এগুলি বিশেষ কায়দায় কসাইরা খাসিতে রূপ দেয়। যা সরল বিশ্বাসে কিনে প্রতিনিয়ত ভোক্তারা ঠকছেন। প্রতারক এই সব খাসি বিক্রেতারা খাসির একটি পায়ের সাথে জবাইয়ের পর বকরির একটি পা মিলিয়ে ঝুলিয়ে রেখে খাসির মাংস বলে বিক্রি করেন। মাংস কেটে ওজন দেওয়ার আগে পলিথিন ব্যাগে রাখার সময় হাতে লুকিয়ে রাখা চর্বি বা খাওয়ার অযোগ্য অংশও দ্রুতই মিশিয়ে দিচ্ছেন। এছাড়াও মাংসে পানি মিশিয়েও ওজন অনেক বাড়িয়ে প্রতারণার মাধ্যমে বকরি খাসি বলে বিক্রি করছেন।
মায়ের দোয়া খাসি বিতানের কর্মচারী মনির পাটোয়ারী বলেন, লবনের দাম বেশি হওয়ায় খাসি বা বকরি ছাগলের চামড়া বিক্রি করা যায় না। ঢাকাতে ২০/২৫ টাকা চামড়া। সেক্ষেত্রে আধাকেজি লবনের দাম ১৫ টাকা। তাই চামড়া এবং ময়লা আবর্জনা বস্তা বেধে নদীতে ফেলে দেই। এতে আমাদের পোষায় না। সেজন্য কৌশল করে মাংস বিক্রি করতে হচ্ছে।
মাংস বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমান বাজারে খাসির আমদানী কম। এই ব্যবসায় আগের মতো লাভ নেই। ঢাকার পার্টির জন্য আমরা খাসি ছাগল কিনতে পারি না। তারা বেশি দাম দিয়ে খাসি ছাগল কিনে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছে। আসল খাসির মাংস ১১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও আমাদের পোষাচ্ছে না। তবে বকরির মাংসকে খাসির মাংস বলে বিক্রি করার অভিযোগটি পুরোপুরি সত্য নয়।
লিটন শেখ নামের আরেক কসাই বলেন, মুগুর, ছুরি চাকু ব্যবহার করে মাত্র ১৫ মিনিটেই আমরা একটি ছাগল জবাই করে মাংস ছাড়িয়ে বিক্রি করতে পারি। এখানে দিনে ৬শ’ টাকা হাজিরায় কাজ করছি। বকরি গুলো খাসি বলে চালায় মূলত হোটেল ব্যবসায়ীরা। শহরের প্রায় সব হোটেল রেঁস্তোরাতেই বকরির মাংস খাসি বলে চালানো হচ্ছে। বরং আমরা ক্রেতাদের দাড় করিয়ে রেখে তাদের সামনেই খাসি জবাই করে মাংস বিক্রি করছি।
যদিও খাসি বিক্রেতাদের সংরক্ষিত মজুদাগারে হাতে গোনা ২/৩টি খাসি বাদে সবই বকরি দেখতে পায় এ প্রতিবেদক। বিষয়টি চাঁদপুর জেলা ভোক্তা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নূর হোসেন রূবেলকে অবগত করলে তিনি বলেন, দ্রুতই এই বিষয়ে পালবাজারে খাসির মাংসের দোকানগুলোতে অভিযান পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিষয়ে চাঁদপুর সদরের এসিল্যান্ড মোঃ আল এমরান খানকে অবগত করলে তিনি বলেন, আমরা পালবাজারের খাসির মাংসের পাশাপাশি ৪/৫টি গরুর মাংসের দোকান নিয়েও বিস্তর অভিযোগ পেয়েছি। প্রধান অভিযোগ হচ্ছে পানি মিশ্রিত ও বয়স্ক গরুর মাংস বিক্রি এবং ভোক্তাদের ওজনে কম দেওয়া। অপরদিকে মাংস বিক্রির বাজারের সামনে ত্রেতাদেরকে নিয়ে বিক্রেতাদের টানাটানি করায় সাধারণ লোকজনও সেপথ দিয়ে যেতে বিব্রতবোধ করেন। বিষয়টি নিয়ে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দ্রুতই ব্যবস্থা নিবো।