ঢাকা ১১:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

হাতে ভাঁজা মুড়ি বিলুপ্তির পথে

মনিরুল ইসলাম মনির : আধুনিক জীবনযাত্রা আর পরিবর্তনের ছোঁয়ায় মান্দাতা আমলের ঐতিহ্য হাতে ভাজা দেশি মুড়ি চাঁদপুর থেকে বিলুপ্তির পথে। যান্ত্রিক ব্যবস্থার যাতাকলে আর কালের বিবর্তনে হাতে ভাজা মুড়ি শিল্পটি আজ আর গ্রামের পল্লী-প্রান্তরে দেখা যায় না। মাহে রমজানে মুড়ি ছাড়া ইফতার যেন অকল্পনীয়। বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে নানান খাবারের সঙ্গে এখনও ওতপ্রতভাবে মিশে আছে মুড়ির কদর। হাতে ভাজা মুড়ির স্থান দখল করে নিয়েছে কারখানার মেশিনের তৈরি মুড়ি।

Model Hospital

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার আটটি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বর্তমানে হাতে ভাজা এই মুড়ির বাজার পুরোপুরি আধুনিক কল-কারখানার দখলে। তাই শহর-উপ-শহর আর গ্রাম্য অঞ্চলে মানুষের কাছে মুড়ির কদর থাকলেও হাতে ভাজা মুড়ি মেলে না। শহরের সীমানা ছাড়িয়ে পল্লী গাঁয়ের পরিবার-বাড়িতেও কারখানার মুড়ির দখল। অথচ আগেকার দিনে গ্রামের ছোট-বড় যে কোনো পরিবারে সারা বছরই হাতে ভাজা মুড়ি পাওয়া যেত।

কালের পরিক্রমায় আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় চাঁদপুরের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু কারখানায় মুড়ি উৎপাদিত হওয়ায় হারিয়ে গেছে সু-স্বাদু হাতে ভাজা দেশি মুড়ি। শুধু তাই নয় দেশের বড় বড় নামি-দামি কোম্পানিগুলোও মুড়ি তৈরি করে শহর থেকে শুরু করে পল্লীর ছোটখাটো দোকানগুলোতে পৌঁচ্ছে দিচ্ছে। ফলে এ শিল্পটি আজ একেবারে হারানোর পথে।

মতলব উত্তর উপজেলার ফতেপুর পশ্চিম ইউনিয়নের পূর্ব নাউরী গ্রামে হঠাৎ চোখে পড়ে মুড়ি হাতে ভাজার দৃশ্যটি। ওই গ্রামের নুরুল গাজীর স্ত্রী ফাতেমা বেগম। বয়স ৬০ বছরের কাছাকাছি। তিনি হাত দিয়ে মুড়ি ভাজার কাজে খুব পারদর্শী। এ কাজে তার হাত যশ ভালো। ফাতেমা বেগমের মুড়ি ভাজার অভিজ্ঞতা প্রায় ৪০ বছর। গ্রাম ছাড়াও আশপাশের গ্রামের বিভিন্ন পরিবারের মুড়ি ভেজে দেন। এটা তার পেশা-নেশা দুটোই।

ফাতেমা বেগম বলেন, ছোট সময় থেকেই মা-দাদির কাছ থেকে দেখা ও শেখা। মুড়ি ভাজাও একটি শিল্প। সহজ মনে হলেও এর কায়দা আছে। সবার হাতে মুড়ি ভালো হয় না।

তিনি বলেন, ভাতের চাল আর মুড়ির চাল এক রকম হলে হয় না। ধান সংগ্রহ করে প্রথমে আধাসিদ্ধ তারপর পুরোপুরি সিদ্ধ করে রোদে শুকিয়ে তা দিয়ে মুড়ির চাল তৈরি করা হয়। এরপর সেই চাল থেকে তৈরি হয় হাতে ভাজা দেশি মুড়ি। হাতে ভাজা মুড়ি সু-স্বাদু ও স্বাস্থ্য সম্মত। তবে এখনও এর চাহিদা থাকলেও পাওয়া যায় না। তাই গ্রামের মানুষও মুড়ির দরকার হলে দোকান থেকে এক প্যাকেট কিনে এনে চাহিদা পূরণ করেন।

ফাতেমা বেগম বলেন, কারখানার মুড়ির চেয়ে আমাদের তৈরি মুড়ির হাতে ভাজা একটু কষ্ট বেশি, সময় লাগে বেশি। দামও একটু বেশি। আর কোম্পানির মুড়িতে রাসায়নিক দ্রবাদি ব্যবহার করা হয়। অনেক কারখানায় আবার ইউরিয়া সারের পানি মুড়িতে মিশ্রিত করার কারণে সাদা, হালকা ও চকচকে মনে হয়।

তিনি বলেন, আমাদের এলাকায়ও বর্তমানে মুড়ির কারখানা উৎপাদিত হওয়ার কারণে আমরা নারীরা কর্মহীন হয়ে পড়ছি। এখন আর মুড়ি ভাজার কাজে কেউ যেতেই চায় না। কারণ আগের মতো মুড়ি ভেজে আর লাভ নেই। তারপরও বিভিন্ন মানুষ মুড়ি ভাজার কাজে ডাক দিলে বসে থাকতে পারি না।

এ বিষয়ে পূর্ব নাউরী গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মো. সিরাজ খাঁ (৭০), নান্নু মোল্যা (৮০), জরুনা বেগম (৬৯) বলেন, আমরা ছোটকাল থেকে দেখে এসেছি, খেয়ে এসেছি হাতে ভাজা মুড়ি। এখনও নিজেদের জমির ধান থেকে আলাদাভাবে মুড়ি ভাজার জন্য চাল তৈরি করে মুড়ি ভাজি এবং সারা বছরই ঘরে মুড়ি থাকে। কোনো সকালে অথবা কোনো বেলা ভাতের বদলে মুড়ি খেয়ে থাকে অনেকেই। তাই বলে গ্রামের সব বাড়িতে হাতে ভাজা মুড়ি পাওয়া যাবে না।

তারা বলেন, এখন আধুনিক যুগ, মানুষ এতো ঝামেলা কষ্ট করতে চায় না। গ্রামের যেকোনো মুদি দোকানে গেলেই কারখানার তৈরি মুড়ির প্যাকেট পাওয়া যায়। যার কারণে হাতে ভাজা মুড়ির ঐতিহ্য আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে। তবে তারা আক্ষেপ করে বলেন, আধুনিক যুগের থেকে আমাদের মান্দাতা আমলের অনেক কিছুই এখনও সবদিকদিয়েই ভালো। যেমন তার মধ্যে হাতে ভাজা মুড়ি।

এ ব্যাপারে মতলব উত্তর পূজা উদযাপন পরিষদের সদস্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শ্যামল কুমার বাড়ৈ বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য ও স্বাদের বিবেচনা করে এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে ক্রেতা সাধারণের উচিত সু-স্বাদু এই হাতে ভাজা দেশি মুড়ির স্বাদ নেওয়া।
এ বিষয়ে ফতেপুর পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ বলেন, এ চিরচেনা ঐতিহ্য আমাদের মাঝ থেকে প্রায় বিলুপ্তির পথে। এ দৃশ্য হাতেগোনা কিছু পরিবারের ব্যক্তিগত ছাড়া চোখে পড়ে না। নাউরী গ্রামের ফাতেমা বেগমের হাতে মুড়ি ভালো হয়। তার হাত যশ আছে। তিনি প্রায় ৩৫/৪০ বছর ধরে মানুষের পারিবারিকভাবে মুড়ি ভাজার সাহায্য করে থাকেন।

এ প্রসঙ্গে মতলব উত্তর প্রেসক্লাবের সভাপতি বোরহান উদ্দিন ডালিম বলেন, হাতে ভাজা মুড়ি আমাদের একটি হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য। এটা এক ধরনের শিল্প। কিন্তু আমাদের এই পুরনো ঐতিহ্য আর শিল্পটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে হাতে ভাজা মুড়ির সঙ্গে বর্তমানে কারখানায় তৈরি বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেট মুড়ির তুলনা চলে না। সবদিক দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যাবে হাতে ভাজা মুড়ি অতুলনীয়।

ট্যাগস :

হাতে ভাঁজা মুড়ি বিলুপ্তির পথে

আপডেট সময় : ০৪:০৯:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ এপ্রিল ২০২২

মনিরুল ইসলাম মনির : আধুনিক জীবনযাত্রা আর পরিবর্তনের ছোঁয়ায় মান্দাতা আমলের ঐতিহ্য হাতে ভাজা দেশি মুড়ি চাঁদপুর থেকে বিলুপ্তির পথে। যান্ত্রিক ব্যবস্থার যাতাকলে আর কালের বিবর্তনে হাতে ভাজা মুড়ি শিল্পটি আজ আর গ্রামের পল্লী-প্রান্তরে দেখা যায় না। মাহে রমজানে মুড়ি ছাড়া ইফতার যেন অকল্পনীয়। বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে নানান খাবারের সঙ্গে এখনও ওতপ্রতভাবে মিশে আছে মুড়ির কদর। হাতে ভাজা মুড়ির স্থান দখল করে নিয়েছে কারখানার মেশিনের তৈরি মুড়ি।

Model Hospital

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার আটটি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বর্তমানে হাতে ভাজা এই মুড়ির বাজার পুরোপুরি আধুনিক কল-কারখানার দখলে। তাই শহর-উপ-শহর আর গ্রাম্য অঞ্চলে মানুষের কাছে মুড়ির কদর থাকলেও হাতে ভাজা মুড়ি মেলে না। শহরের সীমানা ছাড়িয়ে পল্লী গাঁয়ের পরিবার-বাড়িতেও কারখানার মুড়ির দখল। অথচ আগেকার দিনে গ্রামের ছোট-বড় যে কোনো পরিবারে সারা বছরই হাতে ভাজা মুড়ি পাওয়া যেত।

কালের পরিক্রমায় আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় চাঁদপুরের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু কারখানায় মুড়ি উৎপাদিত হওয়ায় হারিয়ে গেছে সু-স্বাদু হাতে ভাজা দেশি মুড়ি। শুধু তাই নয় দেশের বড় বড় নামি-দামি কোম্পানিগুলোও মুড়ি তৈরি করে শহর থেকে শুরু করে পল্লীর ছোটখাটো দোকানগুলোতে পৌঁচ্ছে দিচ্ছে। ফলে এ শিল্পটি আজ একেবারে হারানোর পথে।

মতলব উত্তর উপজেলার ফতেপুর পশ্চিম ইউনিয়নের পূর্ব নাউরী গ্রামে হঠাৎ চোখে পড়ে মুড়ি হাতে ভাজার দৃশ্যটি। ওই গ্রামের নুরুল গাজীর স্ত্রী ফাতেমা বেগম। বয়স ৬০ বছরের কাছাকাছি। তিনি হাত দিয়ে মুড়ি ভাজার কাজে খুব পারদর্শী। এ কাজে তার হাত যশ ভালো। ফাতেমা বেগমের মুড়ি ভাজার অভিজ্ঞতা প্রায় ৪০ বছর। গ্রাম ছাড়াও আশপাশের গ্রামের বিভিন্ন পরিবারের মুড়ি ভেজে দেন। এটা তার পেশা-নেশা দুটোই।

ফাতেমা বেগম বলেন, ছোট সময় থেকেই মা-দাদির কাছ থেকে দেখা ও শেখা। মুড়ি ভাজাও একটি শিল্প। সহজ মনে হলেও এর কায়দা আছে। সবার হাতে মুড়ি ভালো হয় না।

তিনি বলেন, ভাতের চাল আর মুড়ির চাল এক রকম হলে হয় না। ধান সংগ্রহ করে প্রথমে আধাসিদ্ধ তারপর পুরোপুরি সিদ্ধ করে রোদে শুকিয়ে তা দিয়ে মুড়ির চাল তৈরি করা হয়। এরপর সেই চাল থেকে তৈরি হয় হাতে ভাজা দেশি মুড়ি। হাতে ভাজা মুড়ি সু-স্বাদু ও স্বাস্থ্য সম্মত। তবে এখনও এর চাহিদা থাকলেও পাওয়া যায় না। তাই গ্রামের মানুষও মুড়ির দরকার হলে দোকান থেকে এক প্যাকেট কিনে এনে চাহিদা পূরণ করেন।

ফাতেমা বেগম বলেন, কারখানার মুড়ির চেয়ে আমাদের তৈরি মুড়ির হাতে ভাজা একটু কষ্ট বেশি, সময় লাগে বেশি। দামও একটু বেশি। আর কোম্পানির মুড়িতে রাসায়নিক দ্রবাদি ব্যবহার করা হয়। অনেক কারখানায় আবার ইউরিয়া সারের পানি মুড়িতে মিশ্রিত করার কারণে সাদা, হালকা ও চকচকে মনে হয়।

তিনি বলেন, আমাদের এলাকায়ও বর্তমানে মুড়ির কারখানা উৎপাদিত হওয়ার কারণে আমরা নারীরা কর্মহীন হয়ে পড়ছি। এখন আর মুড়ি ভাজার কাজে কেউ যেতেই চায় না। কারণ আগের মতো মুড়ি ভেজে আর লাভ নেই। তারপরও বিভিন্ন মানুষ মুড়ি ভাজার কাজে ডাক দিলে বসে থাকতে পারি না।

এ বিষয়ে পূর্ব নাউরী গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মো. সিরাজ খাঁ (৭০), নান্নু মোল্যা (৮০), জরুনা বেগম (৬৯) বলেন, আমরা ছোটকাল থেকে দেখে এসেছি, খেয়ে এসেছি হাতে ভাজা মুড়ি। এখনও নিজেদের জমির ধান থেকে আলাদাভাবে মুড়ি ভাজার জন্য চাল তৈরি করে মুড়ি ভাজি এবং সারা বছরই ঘরে মুড়ি থাকে। কোনো সকালে অথবা কোনো বেলা ভাতের বদলে মুড়ি খেয়ে থাকে অনেকেই। তাই বলে গ্রামের সব বাড়িতে হাতে ভাজা মুড়ি পাওয়া যাবে না।

তারা বলেন, এখন আধুনিক যুগ, মানুষ এতো ঝামেলা কষ্ট করতে চায় না। গ্রামের যেকোনো মুদি দোকানে গেলেই কারখানার তৈরি মুড়ির প্যাকেট পাওয়া যায়। যার কারণে হাতে ভাজা মুড়ির ঐতিহ্য আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে। তবে তারা আক্ষেপ করে বলেন, আধুনিক যুগের থেকে আমাদের মান্দাতা আমলের অনেক কিছুই এখনও সবদিকদিয়েই ভালো। যেমন তার মধ্যে হাতে ভাজা মুড়ি।

এ ব্যাপারে মতলব উত্তর পূজা উদযাপন পরিষদের সদস্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শ্যামল কুমার বাড়ৈ বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য ও স্বাদের বিবেচনা করে এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে ক্রেতা সাধারণের উচিত সু-স্বাদু এই হাতে ভাজা দেশি মুড়ির স্বাদ নেওয়া।
এ বিষয়ে ফতেপুর পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ বলেন, এ চিরচেনা ঐতিহ্য আমাদের মাঝ থেকে প্রায় বিলুপ্তির পথে। এ দৃশ্য হাতেগোনা কিছু পরিবারের ব্যক্তিগত ছাড়া চোখে পড়ে না। নাউরী গ্রামের ফাতেমা বেগমের হাতে মুড়ি ভালো হয়। তার হাত যশ আছে। তিনি প্রায় ৩৫/৪০ বছর ধরে মানুষের পারিবারিকভাবে মুড়ি ভাজার সাহায্য করে থাকেন।

এ প্রসঙ্গে মতলব উত্তর প্রেসক্লাবের সভাপতি বোরহান উদ্দিন ডালিম বলেন, হাতে ভাজা মুড়ি আমাদের একটি হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য। এটা এক ধরনের শিল্প। কিন্তু আমাদের এই পুরনো ঐতিহ্য আর শিল্পটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে হাতে ভাজা মুড়ির সঙ্গে বর্তমানে কারখানায় তৈরি বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেট মুড়ির তুলনা চলে না। সবদিক দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যাবে হাতে ভাজা মুড়ি অতুলনীয়।